18.6 C
New York
Wednesday, May 25, 2022

আহারে জীবন

বাথরুম পেলে কোন কিছুই ভালো লাগেনা । জোরসে চাপলে তো কোনই কথা নেই । তার উপরে সামনে যদি দশ জনের লাইন থাকে । আমার মাথায় তখন ১০ এর ঘরের নামতা চলছে । দশ এক্কে দশ, দশ দুগুনে বিশ ।

আমি কোনই আশা ভরসা দেখছিনা । বিপদ সংকেত ও চলছে দশ নম্বর ।
আজই মাত্র নতুন সাদা জিন্সের প্যান্ট পরে এসেছি । এটা আর কতক্ষণ সাদা থাকবে তা আল্লাহ পাক ই জানেন ।

- Advertisement -

আমাদের মসজিদের হুজুর বলেছিলেন “ আল্লাহ পাক সম্মানী ব্যাক্তির সম্মান রক্ষা করেন” ।

“ইয়া আল্লাহ পাক এই সাদা জিন্সের প্যান্ট পরিহিত সম্মানিত মানুষটির সম্মান তুমি রক্ষা করো খোদা, আমাকে এই বিপদ থেকে মুক্ত কর” ।

কে যেন বলেছিল “মন যখন উত্তেজিত থাকবে, উল্টোদিকে গুনবে” ।

এখন আমি বাধ্য হয়েই উল্টো গুনছি । কারণ একজন বের হলে হবে নয়, আরেকজন বের হলে হবে আট ।

কিন্তু যে লোক ঢুকেছে তার তো বের হওয়ার নাম গন্ধটাই নেই । সে কি ভিতরে এক ঘন্টার ইউটিউব ভিডিও দেখছে নাকি কে জানে ? আজকাল মোবাইল ফোন এসে এই এক সমস্যা । যেখানে সেখানে মানুষ ভিডিও করে । আবার যেখানে সেখানে মানুষ ভিডিও দেখে ।

“ভাই গো তাড়াতাড়ি বের হন ভাই” ।

এর মাঝেই আমার পুরাতন প্রেমিকা দীপ্রার সাথে দেখা । সে আমাকে দেখে একটা মুচকি মেয়েলি হাসি দিলো । আমিও এই দশ নাম্বার বিপদ সংকেত নিয়েও একটা হাসি দিলাম । হাসিটা নিতান্তই মলিন ।

দীপ্রা বেসিক্যালি পাশের ফিমেল টয়লেটে গিয়েছিল । ওটাতে ভিড় নেই বললেই চলে । পুরানো প্রেমিকার সাথে যে কোন যায়গায় দেখা হওয়াটাই একটু বিব্রতকর । উপরন্তু যদি যায়গাটা হয় পাবলিক টয়লেট তাহলে তো সেই বিব্রতবোধটা আরও বহুগুণ বাড়বে তা বলাই বাহুল্য ।

আমি দীপ্রার কথা ভাববার চেষ্টা করলাম । ওর সাদা ফরসা গালের নীলচে রগটার কথা মনে করার চেষ্টা করলাম ।

কিন্তু এই দশ নম্বর সিগন্যালে কোন কিছুই ভালো লাগছেনা । আমার সমস্ত ভালোলাগা এখন একটা কাজেই কেন্দ্রীভূত ।

আর দীপ্রার তো কাজ শেষ । ওর কথা পরে ভাববো । সরি দীপ্রা ।

লাইনের এক্কেবারে সামনে থাকা লোকটা দরজায় জোরে জোরে টোকা মারলো । “ও ভাই ঘুমায়া গ্যালেন গা নি?, ভাইরে কি চাদ্দর বালিশ দিমু ।”

আমি ঐকিক নিয়মের অংক কষা শুরু করলাম “একজন মানুষের গড়ে যদি ৭ মিনিট করে লাগে, তবে দশ জন মানুষের গড়ে কত মিনিট লাগবে?”

অংকের প্রশ্ন মনে মনে করে নিজেই এই উত্তর বের করলাম ৭*১০=৭০ মিনিট ।

উত্তর বের করে মেজাজ আরো গরম হয়ে গেল । এই দশ নাম্বার সিগন্যাল নিয়ে ৭০ মিনিট অপেক্ষা করা তো একেবারেই অসম্ভব ।

“কি হবে আমার?”
“কি হবে এই সাদা ফুলপ্যান্ট এর?”

এরকম নানবিধ প্রশ্ন মনে ঘুরপাক খাচ্ছে ।

প্রথম জন বের হলো । আমি হারাধনের দশটি পুত্রের গল্পটা মনে করার চেষ্টা করলাম ।

“আচ্ছা কি হয়েছিলো, হারাধনের দশটি পুত্রের ? ওরাও কি টয়লেটে গিয়েই হারিয়ে গিয়েছিল ?”

আমার প্রতিটা চিন্তাতেই টয়লেটের ইস্যু চলে আসছে ।

ভেতর থেকে গানের গুণগুণ আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে । “আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে, শাখে শাখে পাখি ডাকে, কি যে শুধা চারিপাশে…”

লাইনে এবারে এক নাম্বারে দাঁড়ানো লোকটা চিৎকার দিয়ে বললো “ এই যে কিশোর কুমার তাড়াতাড়ি করেন, অ্যাহ, কি আনন্দ আকাশে বাতাসে? আমার লাগছে জোড়ে আর উনার হচ্ছে আনন্দ…”

আমি মনে মনে ভাবলাম “এটা তো কিশোর কুমার গাননি, এটাতো অনুপ ঘোষাল গেয়েছিলেন, এটা বোধকরি ‘হীরক রাজার দেশে’ মুভিতে গাওয়া হয়েছিল ।

আচ্ছা হীরক রাজার দেশে টয়লেটের কি অবস্থা ছিলো? মানুষ জন কি বাইরেই কাজ সারতেন ? আচ্ছা হীরক রাজার দেশ আর আমাদের দেশের মধ্যে পার্থক্য কি? আচ্ছা হীরক রাজ ও কি বাহিরেই কাজ সারতেন?”

ঘুরে ফিরে মনের ভেতরে টয়লেটের চিন্তা আসতেই থাকলো । যেটাই চিন্তা করি সেটাতেই টয়লেটের চিন্তা চলে আসে ।

“ আমাদের দেশের নতুন পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৬ কোটি ৩৭ লাখ মানুষ আছে । আচ্ছা টয়লেটের সংখ্যা কত হবে আমাদের দেশে ? প্রতিদিন একটা মানুষ গড়ে যদি আধা কেজি করে … তবে ১৬ কোটি ৩৭ লাখ মানুষ দ্বারা নির্গত জিনিসের ওজন কত হবে?”

মাথার মধ্যে টয়লেটের চিন্তা এসেই যাচ্ছে ।

আমাদের ওয়াসাকে ধন্যবাদ দিতেই হয় । এত টনকে টন বর্জ্যকে তারা মাটির নীচে লুকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে । এগুলো কয়েকশো কেজি বের হলেই তো…উহ হু …

আমার সামনে আরো ০৮ জন । কার পেটে যে কি পরিমাণ আছে উপর ওয়ালাই জানেন ? আবার কার যে কি ধরনের কোয়ালিটির জিনিস আছে তাও উনিই জানেন । মানে ধরুন শক্ত হলে সময় বেশী, নরম হলে সময় কম ।
আমি মনে মনে আল্লাহপাকের কাছে দোয়া করলাম “ইয়া আল্লাহ তুমি এই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর উপর ঠাটা ফেলো, ওরা ভস্মীভূত হোক । ওদেরকে টয়লেটের ভিতরে ফ্লাশ করে দাও”

আমি ভালো কিছুও চিন্তা করতে পারতাম । কিন্তু এই মুহূর্তে শুধুই ধংসাত্মক কথাবার্তা আর সাথে ঘুরেফিরে টয়লেটের কথা মাথায় আসছে ।

একবার তাবলীগে গিয়েছিলাম । টয়লেটে সেবারও বিশাল লাইন । আমার খুব খারাপ অবস্থা । আমার সামনে এক ভাই সড়ে দাঁড়ালেন বললেন “ভাই আমি আরও কিছুক্ষণ সহ্য করতে পারব । আপনি আগে যান । আল্লাহ পাক আপনাকে সহজ করে দিন” ।

আমি লোকটার জন্য অনেক দোয়া করেছিলাম । কত ভালো মানুষই আছেন এই দুনিয়াতে । সেবার তাবলীগে একে একে সাতজন মুসুল্লি ভাই সড়ে দাঁড়িয়েছিলেন ।

কিন্তু এবার তো সামনে সেরকম কোন ভাইকে দেখছিনা । আমি ভাবলাম রিকুয়েস্ট করে দেখি । আমি জিজ্ঞাসা করলাম আমার সামনে দাঁড়ানো মোটা করে মানুষটিকে ।

বললাম “ভাইয়ার কি অনেক চাপ?”

“না কোন চাপই নাই, অলরেডি তো সাইরাই ফালাইছি মনে হয়” উনার অকপট উত্তর ।

কাকে কি অনুরোধ করছি ।
আর পারছিনা । আমার ঘাম ছুটে যাচ্ছে ।

“আচ্ছা দীপ্রা এখন কি করে?” মনে মনে প্রশ্ন করলাম ।
“আরে দূর ব্যাটা তোর দীপ্রার খ্যাতা পুড়ি । ব্যাটা আগে নিজের সাদা জিন্সের প্যান্টটারে বাঁচা ব্যাটা ।“
নিজেই মনে মনে উত্তর দেই ।

আর মাত্র চার জন । আমার সামনের মোটা লোকটা কতক্ষণ যে লাগাবে উপরওয়ালাই জানেন । দেখে তো মনে হচ্ছে তিন চার কেজি আছে ।
কি যে আবোল তাবোল ভাবছি । আচ্ছা ভালো কিছু ভাবা যায়না ।

কবিগুরু লিখেছিলেন
“বিপদে মোরে রক্ষা কর, এ নহে মোর প্রার্থনা –
বিপদে আমি না যেন করি ভয়” ।

আচ্ছা আমি তো জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি গিয়েছিলাম । ওখানে কতগুলো টয়লেট ছিল, সেটা দেখা হয়নি ।

এদিকে সামনের টয়লেটের কাঠের দরজাটাকে আমার বিদ্রোহী কবি নজরুলের “কারার ওই লৌহকপাট” এর মতই মনে হচ্ছিলো ।

আহা কি যথার্থই না মনে হচ্ছিলো জাতীয় কবির সেই কবিতাটি । “ কারার ওই লৌহকপাট, ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট” ।
আহা উনাকে এই জন্যেই জাতীয় কবি বলা হয়, জাতির দুঃখ দুর্দশা উনি ভালোভাবেই বুঝেছিলেন ।

আমিও একটা বিদ্রোহী কবিতা লিখবো “ভাঙ সব, কোপা সামছু কোপা…”

আর পারছিনা, পেটের ভেতরে গরুর কালা ভুনা, মোরগ মোসাল্লাম সব মিলে মিশে একাকার, মুরগীটাই বোধ কক কক করে পেটের ভেতরে ডাকছে ।

আর পুরান ঢাকার টয়লেটের টিস্যু দিয়ে বানানো মাঠা পেটের ভেতরে আজব এক ফিলিংস তৈরী করছিলো । “আচ্ছা ভেতরে কি টয়লেট টিস্যু আছে?” মনে মনে ভাবলাম ।

আবারো নিজেই নিজের উত্তর দিলাম “ হালায় আর একটু হলে তুই প্যান্টেই, আর আছস টিস্যু লয়া” ।

ধীরে ধীরে আমার সামনের মোটা লোকটাও ঢুকার সুযোগ পেল । “ইয়া পাক পারওয়ারদেগার উনার জন্য সবকিছু সহজ করে দাও, উনি যেন খুব সহজেই আর তাড়াতাড়িই বের হয়ে আসে” ।

“এই বুঝি হয়ে গেল, কে যেন পেটের ভেতর থেকে গাইছে “বাঁধ ভেঙ্গে দাও, বাঁধ ভেঙ্গে দাও… বাঁ…ধ” এই বোধহয় সব বাঁধ ভেঙ্গেই গেল” ।

“আরে আমার আব্বু, তোমাকে আর মোটা বলবোনা, তাড়াতাড়ি বের হও গুলু মনা…বের হ হালার পুত…”

দরজায় লাথি মারতে ইচ্ছে হচ্ছে আমার । মনে হচ্ছে দরজা ভেঙ্গে দেখি মোটু কি করছে । শালা মনে হয় আধা ঘন্টা আগে গ্যাছে ।

“না খারাপ কথা বলবোনা, বের হও বাবু সোনা” ।

আবার দীপ্রা এলো, এবার তার পিচ্চিটাকে নিয়ে । ও আমায় দেখে আবার হাসলো । বোধহয় মনে মনে বললো “কি এখনও যেতে পারনি?”

আজই দুবার ওর সাথে দেখা হতে হবে, আমি দুপা শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছি । আচ্ছা আমার মুখ দেখে কি বুঝা যাচ্ছে যে আমার জোরে …” ।

“ওর পিচ্চিটা ওর মত সুন্দর হয়নি, হবেই বা কিভাবে? হাগু মার্কা চেহারার গাধাটাকে বিয়ে করেছে না” । কি সব ভাবছি । হাগু মার্কা আবার কারুর চেহারা হয় নাকি ? সবকিছুতেই ওই জিনিসটা চলে আসছে ।

অবশেষে আমার মোটা বাবু সোনা বের হচ্ছেন । আমি অলরেডি প্যান্টের বেল্ট ঢিলে করে রেখেছিলাম । আমারও গাইতে ইচ্ছে হলো – “আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে, শাখে শাখে পাখি ডাকে, কি যে শুধা চারিপাশে…”

আমি বীর দর্পে ঢুকতেই যাচ্ছিলাম । ঢুকার ঠিক আগ মুহূর্তে মোটা মামা আমার কানে কানে হাসতে হাসতে বললেন “ভাই ভেতরে পানি নাই” ।

আহারে আমার সাদা জিন্সের প্যান্টটা ! এবার কি হবে? মানে ক্যামনে কি?

সমাপ্ত

কলমে তৈহিদ রিয়াজ

Related Articles

Leave a Comment:

Stay Connected

22,025FansLike
3,327FollowersFollow
18,600SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles